অসমাপিকা মহাকালের প্রস্থান : কাঁদছে বাংলাদেশ

গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের অতন্ত্র প্রহরী বাংলাদেশের প্রথম, এশিয়ার দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী, দিনাজপুরের কন্যা বিএনপি চেয়ারপার্সন তিনবারের সফল রাষ্ট্রপ্রধান বেগম খালেদা জিয়ার জীবনাবসানে বাংলার ভাগ্যাকাশে নেমে এসেছে এক শোকের ছায়া।
তাঁর প্রিয় জন্মভূমি দিনাজপুরের সর্বস্তরের জনসাধারণ শোকে মুহ্যমান। শোক ছড়িয়ে পড়েছে ঘরে ঘরে, প্রান্তিক জনপদে। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের মাঝে দেখা দিয়েছে অভিভাবক হারানোর শূন্যতা।
মঙ্গলবার ( ৩০ ডিসেম্বর)মহাকালের এই মহাকাব্যের পরিসমাপ্তিতে সকাল থেকেই জেলার ১৩টি উপজেলা, ১০৩টি ইউনিয়ন ও ৯টি পৌরসভা থেকে নেতাকর্মীরা শহরের গনেশতলা বিএনপি’র জেলা কার্যালয়ে আসতে শুরু করেন। প্রিয় নেত্রীর প্রয়াণে আগতদের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। দেশ হারালো এক মহান দেশপ্রেমিক নেত্রীকে। তিনি দেশপ্রেম, সততা, প্রজ্ঞা, উদারতার জন্য চিরকাল ইতিহাসের অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবেন।
দিনাজপুর জেলা বিএনপি’র সভাপতি অ্যাড.মো.মোফাজ্জল হোসেন দুলাল বলেন, আমাদের দিনাজপুরের মানসকন্যা, মাদার অব ডেমোক্রেসি বিএনপি’র চেয়ারপার্সন যাকে ছাড়া আমরা কিছুই বুঝি না। তাঁকে দিনাজপুর সদর আসনে প্রার্থী ঘোষণার পর মাত্র কয়েকদিন পূর্বে আমরা ক’জন জেলার নেতৃবৃন্দ তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেয়েছিলাম। তাঁর শিশুসুলভ আচরণ আমাদের বিমোহিত করেছিল। আমরা দিনাজপুরের মানুষ তাঁকে প্রার্থী হিসেবে পেয়ে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমাদের সেই স্বপ্ন, স্বপ্নই রয়ে গেল। জাতির বড় প্রয়োজনের সময়ে তাঁকে আমরা হারালাম!
তিনি বলেন, এই দেশ, এই মাটি, এই মানুষ যতদিন থাকবে, জনগণ দেশের স্বার্থ রক্ষায় আপোসহীন নেত্রী খালেদা জিয়াকে ততদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ রাখবে। তিনি থাকবেন আমাদের হৃদয়ের নেত্রী হিসেবে।
জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার আহম্মেদ কচি বলেন, দিনাজপুরের কৃতি সন্তান বেগম খালেদা জিয়া দেশের এক ক্রান্তিলগ্নে গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসেছিলেন। দেশে যখনই কোনো সংকট তৈরি হয়েছে, তখনই তিনি শক্ত হাতে দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এটা আমাদের জন্য গৌরবের বিষয় ছিল। আমরা তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। তাঁর শূন্যতা কখনোই কোনভাবে পূরণ হবে না । রাজনীতির অঙ্গনে আমরা একজন প্রকৃত অভিভাবক হারালাম। এ সময়ে তাঁর বড় বেশি প্রয়োজন ছিল!
জেলা বিএনপি’র সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. মোকাররম হোসেন বলেন, বেগম খালেদা জিয়া সুষ্ঠু ধারার রাজনীতির মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন। তাঁর শূন্যতায় দেশের রাজনীতিতে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। দিনাজপুরে মেডিক্যাল কলেজ, জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন, হাসপাতাল ও রিসার্চ সেন্টার, শিক্ষা বোর্ডসহ যত উন্নয়ন হয়েছে সব হয়েছে দেশনেত্রীর হাত ধরে। উনার যে স্বপ্নগুলো রয়ে গেছে তা আমরা বাস্তবায়ন করবো।ইংশাআল্লাহ।
দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষিকা রওশনারা ছবি বলেন, তিনি দেশের জন্য যেমন গর্বের ছিলেন, তেমনি আমরাও গর্ব করে বলতাম বেগম খালেদা জিয়া এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি বড় অসময়ে চলে গিয়ে সবাইকে কাঁদিয়ে গেলেন!
ঢাকার বসুন্ধরা এভারকেয়ার হাসপাতালে ৩৭ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে মঙ্গলবার সকাল ৬ টার দিকে তিনি চির বিদায় নিলেন বলে চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন।
প্রসঙ্গত, খালেদা জিয়ার মরহুম পিতা ইস্কান্দর মজুমদার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসার সুবাদে পরিবার নিয়ে তাঁর দিনাজপুরে আগমন ঘটেছিল। তাঁরা দিনাজপুর শহরের মুদিপাড়ায় একটি বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। তাঁর মায়ের নাম বেগম তৈয়বা মজুমদার। বেগম খালেদা জিয়ার পিতৃ প্রদত্ত নাম খালেদা খানম পুতুল। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। পরে তাঁরা শহরের বালুবাড়ী শহীদ মিনার মোড়ে তৈয়বা ভিলায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বাড়িটি বর্তমানে ভাড়া দেওয়া রয়েছে। সেই বাড়িটিতে একটি প্রাইভেট হাসপাতাল চলছে। তবে উপরতলায় তাঁর বাবা-মা যে ঘরগুলোতে থাকতেন তা এখনো সংরক্ষিত রয়েছে। দিনাজপুর শহরের ফরিদপুর কবরস্থানে খালেদা জিয়ার মমতাময়ী মা -বাবা ও বড় বোন শায়িত আছেন ।
খালেদা খানম পুতুল ৫ বছর বয়সে দিনাজপুরের মিশন স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৬০ সালে তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। একই বছর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। এরপর থেকে তিনি খালেদা জিয়া বা বেগম খালেদা জিয়া নামে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি স্বামীর সামরিক চাকরির সুবাদে বাহিরে চলে যাওয়ার পূর্বে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত দিনাজপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজে (বর্তমানে দিনাজপুর সরকারি কলেজ) অধ্যায়ন করেন। পরে স্ব শিক্ষায় শিক্ষিত হন।
তিনি নারীর শিক্ষা ও অগ্রগতির ব্যাপারে সোচ্চার ছিলেন। বিশেষ করে গ্রামীণ নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর উদ্যোগ ছিল খবরের বড় শিরোনাম। তাঁর শাসনামলে ইউনেস্কো, ইউনিসেফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক সহ অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশকে একটি “মডেল ফর গার্লস এডুকেশন “হিসেবে চিহ্নিত করে। এমনকি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার সূচনাও তিনি করেছিলেন। এছাড়াও ২০০১ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা সমুন্নত রাখতে গঠন করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। ২০০২ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতা বাড়ানো হয় এবং শহীদ পরিবারে রাষ্ট্রীয় অনুদান দেয়া হয়। ২০০৩ সালে একাত্তরের বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। ২০০৬ সালে ঢাকার প্রতিটি রাস্তার নামকরণ করা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের নামে,বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের দেহাবশেষ দেশে নিয়ে আনেন। ১৯৯৯ সালে ১৫ ডিসেম্বর খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পদক প্রদান করা হয় এবং তারামন বিবিকে খুঁজে নিজ হাতে ‘বীর প্রতীক ‘পদক পরিয়ে দেন তিনি।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি দিনাজপুরের প্রথম প্রার্থী হওয়ায় সমগ্র জেলা ও শহরবাসীর মধ্যে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছিল।এখানে খালেদা জিয়ার জন্ম ও শৈশবের বেড়ে ওঠা হলেও রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনো এই এলাকার জনপ্রতিনিধি হিসেবে প্রার্থী হননি। তবে সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত দিনাজপুর-৩ আসন থেকে বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তার বড় বোন খুরশীদ জাহান হক।
নিজের জন্মস্থানে এবার প্রথম প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুর-৩ (সদর) আসন থেকে ধানের শিষের প্রার্থী হিসেবে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মনোনয়নপত্র গত ২৮ ডিসেম্বর জমা দিয়েছিলেন জেলা বিএনপি’র নেতৃবৃন্দ। তাঁকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকা দিনাজপুরবাসীর স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল!
খালেদা জিয়ার জীবনাবসানে দিনাজপুর জেলা বিএনপি, অঙ্গ সংগঠন, জেলা জামায়াতে ইসলাম, ইসলামী ঐক্য জোট, জাতীয় পার্টি, জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ,সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠন, বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল, দিনাজপুর প্রেসক্লাব, দিনাজপুর সাংবাদিক ইউনিয়নসহ সর্বমহল গভীর শোক প্রকাশ করেছে। শোকবার্তায় তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে তাঁর বিদায়ী আত্মার মাগফেরাত কামনা করা হয়এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করা হয়।













