এলজিইডিতে চাকরি স্থায়ীকরণে কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য

এলজিইডিতে চাকরি স্থায়ীকরণে কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য,ভুল রায় বাস্তবায়নে সরকারের সম্ভাব্য ক্ষতি ছয় কোটি টাকা
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-তে চাকরি স্থায়ীকরণের নামে মোটা অংকের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু অসাধু কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলেও সরকারের সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ছয় কোটি টাকা। বিপরীতে, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল, কনটেম্পট অব কোর্ট, পিএসসি ও আইন মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ঘুষ দিতে না পারায় অনেক কর্মকর্তা চাকরি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন—যাদের দিকে দৃষ্টি নেই এলজিইডি কর্তৃপক্ষের।
ওহাব গ্রুপের ১২ জনের পদোন্নতি ও স্থায়ীকরণ বিতর্ক
সম্প্রতি এলজিইডিতে ‘ওহাব গ্রুপ’ নামে পরিচিত ১২ জন কর্মচারীর ১০ম গ্রেডে পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপন নম্বর: ৪৬.০২.০০০০.০০১.১২.০০৭.২৩-১০৩০১, তারিখ ১৭ নভেম্বর ২০২৫।
সূত্র জানায়, ওহাব গ্রুপের মোট ২৪ জন ২০১১ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন (রিট নং ৮৪৩১/২০১১)। রিট শুনানি শেষে হাইকোর্ট নির্দেশ দেন “পিটিশনারদের এলজিইডির রাজস্ব খাতে স্থায়ী পদে নিয়মিত করতে।”
কিন্তু বাস্তবতা হলো, রিট আবেদনের সময়ই তারা রাজস্ব খাতের কর্মচারী ছিলেন। রায়ে কোথাও পদোন্নতি কিংবা ইফেকটিভ ডেট উল্লেখ ছিল না। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ছিল একটি ভুল রায়, যেখানে রাজস্ব খাতের কর্মচারীকেই আবার রাজস্ব খাতে স্থায়ী করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ওই ২৪ জনের মধ্যে ১২ জন কর্মরত, বাকিরা অবসরপ্রাপ্ত বা মৃত্যুবরণ করেছেন।
১৪ বছরেও বাস্তবায়ন না হওয়া রায়, কিন্তু ঘুষে তড়িঘড়ি কার্যকর সূত্র অনুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে দীর্ঘ ১৪ বছরে এলজিইডিতে ১৩-১৪ জন প্রধান প্রকৌশলী দায়িত্ব পালন করলেও কেউই এই ভুল রায় বাস্তবায়ন করেননি।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক চলতি দায়িত্বের প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ মিয়াকে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে ফাইল মুভমেন্ট শুরু করা হয়। প্রশাসন শাখার একাধিক কর্মকর্তাকেও মোটা অংকের ঘুষ দেওয়া হয়। তবে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রশাসন) ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) ভুল রায়ের ফাইলে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান।
পরবর্তীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন নিয়োগ বিধির কথা উল্লেখ করে বিষয়টি বাতিল করেন। তিনি বলেন,সার্ভেয়ার পদে ১৫ বছর, কার্য সহকারী পদে ২০ বছর চাকরির মেয়াদ বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ও শূন্যপদ থাকা সাপেক্ষে পদোন্নতি সম্ভব কিন্তু ওহাব গ্রুপে সার্ভেয়ার ও কার্য সহকারীর পাশাপাশি কমিউনিটি অর্গানাইজার ও স্টোরকিপার রয়েছেন, যাদের পদোন্নতির জন্য নিয়োগ বিধি সংশোধন অপরিহার্য যা রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়।কোটি টাকার ঘুষ ও এখতিয়ার বহির্ভূত প্রজ্ঞাপন।
সূত্র জানায়, রুটিন দায়িত্বে থাকা সাবেক প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমের সময় আবার তৎপর হয় ওই গ্রুপ। অভিযোগ আছে, তাকে প্রায় এক কোটি টাকা ঘুষ দেওয়া হয়। আশ্বাস দেওয়া হয়, ২০০৬ সাল থেকে চাকরি স্থায়ী দেখানো হলে প্রত্যেকে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাবদ অতিরিক্ত ৩৫–৪০ লাখ টাকা পাবেন।এই প্রক্রিয়ায় প্রশাসন শাখার কিছু কর্মকর্তা ও উচ্চমান সহকারী আর্থিকভাবে লাভবান হন। যদিও পরবর্তীতে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে জাবেদ করিম আর স্থায়ীকরণ আদেশে অগ্রসর হননি।
বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর সময় চূড়ান্ত স্থায়ীকরণ
সবশেষে অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান রুটিন দায়িত্বের প্রধান প্রকৌশলী কাজী গোলাম মোস্তফা ও প্রশাসন শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ওহাব গ্রুপের ১২ জনসহ মোট ১৪ জনের চাকরি স্থায়ীকরণের অফিস আদেশ জারি করেন (স্মারক নং: ৪৬.০২.০০০০.০০১.২৮.০০১.২১-১১১৭৪)।অভিযোগ আছে, সুযোগ বুঝে আরও দু’জনের নাম যুক্ত করা হয়, যাদের একজনের চাকরি নিয়মিত দেখানো হয় ১৯৯৪ সাল থেকে এবং অন্যজনের ১৯৯৮ সাল থেকে।
বক্তব্য পেতে ব্যর্থ প্রতিবেদক চাকরি স্থায়ীকরণ বিষয়ে জানতে প্রতিবেদক একাধিকবার বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী কাজী গোলাম মোস্তফার সঙ্গে মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি সাড়া দেননি। প্রশাসনিক ইউনিটের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।
রুটিন দায়িত্বে প্রজ্ঞাপন বৈধ নয় সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা জানান, রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলীর প্রজ্ঞাপন জারির ক্ষমতা নেই এমন প্রজ্ঞাপন কার্যকর নয় বিষয়টি সরকারের অর্থ তছরুপের শামিল দুদক ও মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বুলবুল আহমদের করুণ বাস্তবতা এলজিইডির আরেক কর্মকর্তা বুলবুল আহমদের ক্ষেত্রেও হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট থেকে চাকরি স্থায়ীকরণের রায় রয়েছে।
কিন্তু ঘুষ দিতে না পারায় ২০১১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত তার রায় বাস্তবায়ন হয়নি। কনটেম্পট অব কোর্ট, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল, পিএসসি ও আইন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশও উপেক্ষিত।অথচ, একটি বিতর্কিত ও ভুল রায় ঘুষের বিনিময়ে তড়িঘড়ি বাস্তবায়নের অভিযোগ উঠেছে।
বুলবুল আহমদের বিষয়টি পরবর্তী সংখ্যায় বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হবে।













