পৌষ মাসে কৃষি কাজে করণীয়-আবুল কালাম আজাদ

কৃষকের শীতকালীন মাঠ ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা
বাংলাদেশের কৃষিপঞ্জিতে পৌষ মাস অর্থাৎ ডিসেম্বর জানুয়ারি হলো রবি মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই মাসে আবহাওয়া শুষ্ক থাকে, রাত দীর্ঘ হয়, হিমেল বাতাস প্রবাহিত হয় যার ফলে বেশিরভাগ ফসলের বৃদ্ধি ও রোগ–পোকার প্রকোপে পরিবর্তন আসে। তাই এই সময় সঠিক পরিচর্যা ও নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ ফসলের ফলন বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখে।
ফসলভিত্তিক, খাতভিত্তিক এবং মাঠ ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী পৌষ মাসে কৃষকের করণীয়গুলো তুলে ধরা হলো।
🔳 ধান চাষ
১. আমন ধান (কাটাই-ঝাড়াই)পৌষের শুরুতেই দেশের বহু জায়গায় আমন ধান কাটা শেষ ধাপে থাকে।ধান কাটার পর পরিষ্কার জায়গায় ২–৩ দিন রোদে শুকানো প্রয়োজন ।
আর্দ্রতা বেশি থাকলে ধানে ঘুণ ধরতে পারে তাই গোলায় তোলার আগে শতভাগ শুকানো জরুরি।খড় পরিষ্কার ও শুকনা অবস্থায় রাখলে গরু-ছাগলের খাদ্য কম খরচে মিলবে।খড়ের নিচে বাঁশের চাটাই বা প্লাস্টিক দিলে নিচের অংশে স্যাঁতসেঁতে হবে না।
২. বোরো ধানের বীজতলা:
এ সময় বোরো বীজতলার যত্ন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।বীজতলায় পানি জমতে দেওয়া যাবে না। জলাবদ্ধতা হলে চারা হলুদ হয়ে যায়।রাতের ঠাণ্ডা বাতাস থেকে রক্ষায় পলিথিন ঢেকে দেওয়া খুবই উপকারী।পাতায় দাগ, গুঁড়ি পোকা বা পচন দেখলে প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।চারা ২৫–৩০ দিন হলে রোপণের উপযুক্ত হয়।
🔳আলু চাষ:
পৌষে আলুর গাছ দ্রুত বাড়ে। তাই এ সময় পরিচর্যার কিছু বিশেষ কাজ জরুরি।জমিতে আগাছা পরিষ্কার রাখলে গাছের খাবার নষ্ট হয় না।মাটিচাঁদা দিলে কন্দ বড় হয় এবং বেশি সংখ্যা পাওয়া যায়।প্রয়োজন অনুযায়ী ইউরিয়া ও পটাশের শীর্ষ ড্রেসিং দিতে হয়।
ঝলসানো রোগ, পাতার দাগ রোগ এই সময় বেশি দেখা যায় লক্ষণ দেখা গেলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।গাছ বিছিয়ে পড়লে খুঁটি বা ডালা দিয়ে সাপোর্ট দেওয়া ভালো।
🔳 গম চাষ:
গম শীত সহনশীল ফসল হলেও সঠিক সেচ ও আগাছা নিয়ন্ত্রণ দরকার।প্রথম সেচ সাধারণত পৌষ মাসেই দিতে হয়।অতিরিক্ত সেচ দিলে গাছ লম্বা হয়ে দানা কম হয়—তাই মাপজোক করে পানি দিতে হবে।জমি আগাছামুক্ত রাখলে গমের ফলন ১৫–২০% পর্যন্ত বাড়ে।পাতায় মরিচা রোগ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে আপনার ইউনিয়নে কর্মরত উপসহকারী কৃষি অফিসার এর পরামর্শ গ্রহণ করুন।
🔳সরিষা চাষ:
সরিষা চাষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ফুল ও শুঁটি গঠনের সময় এই পৌষ মাসেই আসে।ফুল আসার সময় আশেপাশে মৌমাছির চলাচল থাকলে পরাগায়ন ভালো হয়।শুঁটি তৈরি হওয়ার সময় অল্প পানি দিলে দানা ভরাট ভালো হয়।সাদা মাছির আক্রমণ বেশি হয় সপ্তাহে অন্তত একবার খেত ঘুরে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
🔳 শীতকালীন সবজি:
বাঁধাকপি ও ফুলকপি, গুটি বাঁধার সময় মাটিতে আর্দ্রতা বজায় রাখতে হালকা সেচ দিতে হবে।পাতার নিচে প্রজাপতির লার্ভা লুকিয়ে থাকে একবার দেখলে হাতেই ধরতে পারবেন।গাছের গোড়া নরম থাকলে ছাই বা গোবর মিশিয়ে শক্ত করে দিতে হয়।
টমেটো, বেগুন, মরিচ:
ব্লাইট ও ডাউনি মিলডিউ এ সময় বেশি দেখা যায়। বৃষ্টির পানি না থাকলেও কুয়াশার ভেজায় রোগ ছড়ায়।আক্রান্ত পাতা তুলে দূরে ফেলে দিতে হবে।ফলছিদ্র পোকা দেখা দিলে ফেরোমন ট্র্যাপ খুব কার্যকর।
@ লাউ, করলা, কুমড়া, শসা:
মাচার দড়ি শক্ত করে বাঁধতে হবে যাতে ঠাণ্ডা বাতাসে না ছিঁড়ে যায়।ডগা বরফে পোড়া বা শুকিয়ে গেলে ছেঁটে ফেললে নতুন ডগা বের হয়।
🔳 ডাল জাতীয় ফসল:
মসুর, মুগ, খেসারি সব ডাল ফসলেই পৌষ হলো আগাছা দমন ও সেচ ব্যবস্থাপনার সময়।প্রথম ৩০–৪০ দিন আগাছামুক্ত রাখতে পারলে ফসল ভালো হয়।অতিরিক্ত পানি দিলে গাছ হলুদ হয়ে যায় তাই পানি ব্যবস্থাপনায় সতর্ক থাকতে হবে।পাতা পঁচা রোগ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন।
🔳পেঁয়াজ ও রসুন:
পাতায় হলদে ভাব এলে বুঝতে হবে পুষ্টির ঘাটতি—ইউরিয়া সামান্য বাড়াতে হবে।জমি সবসময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে।কাণ্ডে পচন দেখা দিলে ড্রেনেজ পরীক্ষা করুন।
🔳 ফলদ চারা ও বাগান:
পৌষ হলো ফলদগাছ রোপণের উপযুক্ত সময়।পেয়ারা, লেবু, আমড়া, মাল্টা, ড্রাগন ফল সব ধরনের চারাই এখন ভালোভাবে বসে।চারা লাগানোর আগে গর্তে গোবর, ছাই ও দো-আঁশ মাটি মিশিয়ে ফেলুন।নার্সারির চারা ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে যেতে পারে, তাই ওপরদিকে ছাউনি রাখা দরকার।
আম, লিচু, কাঁঠালের গোড়া পরিষ্কার রেখে মাটির ঢিবি করে দিলে পানি জমে না।
🔳গবাদিপশু ও পোলট্রি ব্যবস্থাপনা:
শীতে পশুর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।গরু-ছাগলকে কুসুম গরম পানি খাওয়ালে হজম ভালো হয়।ঘরদোরের ঠাণ্ডা বাতাস ঢোকার দিক বস্তা বা পলিথিন দিয়ে আচ্ছাদিত করুন।মুরগি-হাঁসের খামারে ২৫–৩০° সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রাখা উচিত।শুকনা খড়, ভুসি, খৈল, গুড় মিশিয়ে পশুখাদ্য তৈরি করা যায়।
🔳 মৎস্যচাষ:
পৌষে পুকুরের পানি ঠাণ্ডা হয়ে মাছ তলদেশে চলে যায় এবং খাবার কম খায়।দুপুরে খাবার দিলে মাছ বেশি খায়।পানি কমে গেলে পাশের জমির পানি বা গভীর নালা দিয়ে পানি উঠানো ভালো।পুকুরের ধারে গাছ-ঝোপ পরিষ্কার রাখুন যাতে বেশি রোদ পড়ে।
🔳 বনায়ন ও সামাজিক গাছপালা;
পৌষ হলো গাছ লাগানোর অন্যতম সেরা সময়।বাবলা, আকাশমণি, কড়ই, জারুল, রেইনট্রি সব ধরনের কাঠগাছ এখনই লাগাতে পারেন।গর্তে জৈবসার দিলে চারা দ্রুত বড় হয়।
পৌষ মাস মূলত ফসলের যত্ন, পর্যবেক্ষণ, আগাছা দমন এবং রোগ–পোকার নিয়ন্ত্রণের মাস।এই সময় নিয়মিত মাঠে গেলে,পানি–সেচ ঠিকমতো দিলে এবং রোগ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিলে রবি মৌসুমের সব ফসলেই ভালো ফলন পাওয়া যায়। কৃষকের সচেতনতা ও সময়মতো সিদ্ধান্তই এই মৌসুমে সফলতার চাবিকাঠি।
লেখক: সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ
কেন্দ্রীয় সভাপতি,বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন
কৃষি লেখক ও কথক,বাংলাদেশ বেতার
উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, দৈনিক গ্রামীণ কৃষি
















